October 28, 2026, 12:58 pm
শিরোনাম:
৫৪ তম মৃতুবার্ষিকী স্মরণে ঝিনাইদহে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ভাস্কর্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন। শৈলকুপার ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়ন  ভূমি অফিসে দালাল ছাড়া মেলে না সেবা, বঞ্চিত ভূমি মালিকরা; রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার মাগুরার শ্রীপুরে সাংবাদিকের জমির গাছ তুলে নিল দুর্বৃত্তরা লংমার্চ সফল করতে ঝিনাইদহের মধুহাটিতে জামায়াতের মিছিল ও আলোচনা সভা। অ্যাডভোকেট মাসুম খানের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মোহাম্মদপুরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ। মনাকষা সীমান্তে মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণ”পরিচালনা শুরু করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন ৫৩ বিজিবি। শৈলকূপায় ডোপ টেষ্টে ২ জনের শরীরে প্রমাণ পাওয়া গেল মাদকের। যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ঢাকা উত্তর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী মোঃ নুর আলমের শুভেচ্ছা। ঝিনাইদহে লং মার্চ সফল করতে মধুহাটীতে জামায়াতের জনশক্তি সমাবেশ। ঝিনাইদহ জেলা জাতীয় ছাত্রশক্তির সদস্য সচিব হলেন সাকিব রানা।
Notice :
শৈলকুপায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভ্রূম্যমান আদালতের অভিযান: ২১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা!… ঝিনাইদহে ড্রেন নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা দাবির অভিযোগে দুই কথিত সাংবাদিক আটক” শৈলকূপা উপজেলা শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভুয়া আনসার সদস্য দিয়ে পূজা মন্ডপের ডিউটি চলমান। মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ১৫নং ফুলহরি ইউনিয়ন সুব্রত দধি মিষ্টি ভান্ডারে মিষ্টি বাকি না দেয়ার কারণে সুব্রত উপরে ও তার মায়ের উপরে হামলা! ন্যাম ভবন থেকে সাতক্ষীরার এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর ম/রদে/হ উ/দ্ধার দেবহাটায় প্রতিবন্ধী নারীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে সাবেক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা কুষ্টিয়ার লালন শাহ ব্রিজের পিলারের সাথে ট্রলারের ধাক্কা লেগে শৈলকু/পার দুইজন সহ তিনজন নিখোঁজ। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষকের ৬৬% ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭৫% পদ ফাঁকা অবশেষে ঝিনাইদহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঘুষখোর কর্মকর্তা মুন্তাছির বদলি।

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে দেশে ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেছেন

হাকিকুল ইসলাম খোকন,

 

হাকিকুল ইসলাম খোকন,

মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে দেশে ৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেছেন ।
মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এখন চারতলা ভবন। সবগুলো প্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত হয়েছে ।

এখনো সময় পেলে ‘মাঝি দ্য মাউন্টেন ম্যান’ দেখেন মোশাররফ। বলিউডের বিখ্যাত সিনেমাটি ভারতের বিহারের গেহলর গ্রামে দশরথ মাঝিকে নিয়ে নির্মিত। প্রায় ২২ বছর চেষ্টার পর হাতুড়ি, শাবল নিয়ে পাহাড় কেটে রাস্তা বানাতে পেরেছিলেন দশরথ মাঝি। তাঁর মতো মোশাররফও পাথর ভেঙেছেন।

তবে রাস্তা নয়, ভবন বানাতে। এসএসসির আগেই বাবাকে হারিয়েছিলেন। মোশাররফের ছোট কাঁধে তখন সংসারের বড় বোঝা। সেই ভার কমাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন কাতারে।খবর আইবিএননিউজ ।

কাজ জুটল নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে। সাত ফুটের মতো পাথর ভেঙে পাইলিং করতে হবে। সহকর্মীদের অনেকে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। কিন্তু মোশাররফের সে সুযোগ নেই।
কারণ দেশে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে ছয়টি মুখ—মা আর পাঁচ ভাই-বোন। নীরবে চোখের জল ফেলেছেন। একমনে শক্ত পাথরের গায়ে চালিয়েছেন শাবল, হাতুড়ির আঘাত। পাথর যেন টলে না
একচুলও। উল্টো হাতুড়ি ছিটকে এসে লাগে পায়ে।

যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠেন। হাতে ফোসকা পড়ে। কিন্তু তিনি পিছপা হন না। আবার হাতে তুলে নেন হাতুড়ি। এভাবে ধাপে ধাপে সাফল্যের সোপান উতরে গেছেন তিনি।
মোশাররফ নিজে বেশি দূর পড়তে পারেননি। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ভাই-বোনদের পড়িয়েছেন। ঘামে ভেজা টাকায় এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—দুটি কলেজ, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি মাদরাসা ও একটি কিন্ডারগার্টেন। গড়েছেন দুটি পাঠাগারও। দুই কোটি টাকা সমমূল্যের জমি দিয়েছেন হাসপাতালের জন্য। শতবর্ষ একটি বটগাছ সমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে তাঁর কল্যাণে। বললেন, ‘পড়ালেখার মূল্য আমি বুঝি। জীবিকার তাগিদে এইচএসসি দিয়েই পাড়ি জমাতে হয়েছে বিদেশে। কিন্তু আমার মন পড়েছিল দেশে। টাকার অভাবে এলাকার কারো যেন পড়া বন্ধ না হয়, সে জন্য এত কিছু করা। এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা এখন দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভাবলেই মন নেচে ওঠে খুশিতে।’

কাতারে পাথর ভেঙেছেন : বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী এই মানুষটির পুরো নাম মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী। জন্ম কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ধান্যদৌল গ্রামে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী ছিলেন স্কুল শিক্ষক।

শিক্ষার প্রতি অনুরাগ মোশাররফের রক্তে, বলা যায় উত্তরাধিকার সূত্রেই। তাঁর প্রপিতামহ সিরাজ খান চৌধুরী ১৯৩৭ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন ধান্যদৌল প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৫৭ সালে রাঙামাটিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান করেন মোশাররফের বাবা আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী। নিজ এলাকা থেকে ওই স্কুলে শিক্ষক নিয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। শিক্ষক বাবার সংসারে আর ১০টা শিশুর মতোই হেসেখেলে বড় হচ্ছিলেন মোশাররফ। পঞ্চম শ্রেণিতে

গড়ে তুললেন বিদ্যার বাতিঘর : ধান্যদৌল তো বটেই, আশপাশের কোনো গ্রামে ছিল না কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ নিয়ে দফায় দফায় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সভা। স্কুল করতে সবাই উত্সুক, কিন্তু জমি দিতে কেউ আগ্রহী নয়। এগিয়ে এলেন তরুণ মোশাররফ। এক দিন এক সভায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘কাতারে ঘাম বেচে কিছু পয়সা জোগাড় করেছি। সেটা দিয়েই স্কুলের জন্য জমি কিনব।’

তাঁকে বাহবা দিল সবাই। পরে শুধু জমি নয়, স্কুলের অবকাঠামো থেকে শুরু করে সবই করে দিয়েছেন মোশাররফ। ১৯৮৯ সালে যাত্রা শুরু করল মোশাররফের প্রথম বিদ্যার বাতিঘর—আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। এমপিওভুক্ত হওয়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন হাজারের মতো শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-কর্মচারী ২৪ জন।

নিউইয়র্কে পাড়ি : সে বছরই একটা সুযোগ পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পাড়ি জমান মোশাররফ। সেখানেও শুরুতে ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক। পরে রেস্তোরাঁ, ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ করেছেন। ১৯৯২ সালে ট্যাক্সি চালানোর লাইসেন্স পেলেন মোশাররফ। এর পর থেকে তিন দশকের বেশি সময় ধরে মার্কিন মুলুকে ট্যাক্সি ক্যাব চালাচ্ছেন। প্রচুর আয়, তবে অন্যদের মতো ভাবেননি কেবল নিজের সুখের কথা। বাড়ি-গাড়ি বা আয়েশি জীবনযাপনের পেছনে ব্যয় করেননি অঢেল অর্থ। আয়ের বেশির ভাগই উজাড় করে দিয়েছেন নিজ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড়িয়ে গেছে : ১৯৯৯ সালে তিনি গড়ে তোলেন মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও আব্দুল মতিন খসরু মহিলা কলেজ। পরে গড়েছেন ‘আশেদা- জোবেদা খান চৌধুরী ফোরকানিয়া মাদরাসা’, ‘মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী হাফেজিয়া মাদরাসা ও ‘মুমু-রোহান কিন্ডারগার্টেন’। কঠোর পরিশ্রম করে জমানো টাকা যে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই ব্যয় করছেন তা নয়। আবদুর রাজ্জাক খান চৌধুরী লাইব্রেরি ও ডা. মিজানুর রহমান চৌধুরী কিশোরী পাঠাগার নামে এলাকায় দুটি গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করেছেন। ব্রাহ্মণপাড়ায় ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য দুই কোটি টাকা ব্যয়ে জমিও কিনে দিয়েছেন। ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদের উন্নয়নেও ভূমিকা রেখেছেন। টাকার অভাবে গরিব ছেলেমেয়েরা যাতে শিক্ষাবঞ্চিত না হয়, সে জন্য নিজের নামে ফাউন্ডেশন গড়ে শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত বৃত্তি পেয়েছে ২০০ শিক্ষার্থী। ফাউন্ডেশন থেকে ঘর করে দিয়েছেন ১০টি গৃহহীন পরিবারকে।

মোশাররফের গড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশ ভালোভাবেই চলছে। শিক্ষার মানও যথেষ্ট ভালো। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বড় মাঠ। তাঁর নামের কলেজটি এখন চারতলা ভবন। কলেজটিতে এখন ১০ বিষয়ে স্নাতক ও এক বিষয়ে মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী প্রায় পাঁচ হাজার। এইচএসসির ফলাফলের দিক থেকে কুমিল্লা বোর্ডের সেরা ১০ কলেজের একটি এটি।

১৯৮৯ সালে বাবার নামে স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় শিক্ষার্থী ছিল ১০০-এর মতো। এখন সেখানে পড়ছে এক হাজার শিক্ষার্থী। মোশাররফের প্রতিষ্ঠিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এমপিওভুক্ত হয়েছে।

রক্ষা পেল শতবর্ষী বটগাছ : ধান্যদৌল গ্রামে শ্রীশ্রী কালীমন্দির প্রাঙ্গণে শতবর্ষী প্রাচীন এক বটগাছ। শৈশবে এই গাছতলায় অনেক খেলেছেন মোশাররফ! ২০০৭ সাল জরাজীর্ণ মন্দির সংস্কারে ওই বটগাছ বিক্রির উদ্যোগ নেয় মন্দির কর্তৃপক্ষ। ৭৫ হাজার টাকা দামও ঠিক হয়। মোশাররফ তখন ট্যাক্সি চালান নিউইয়র্কে। স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে খবরটি কানে যায় তাঁর। দেরি না করে তিনি যোগাযোগ করেন গাছটির ক্রেতার সঙ্গে। ফোনে বললেন, ‘ভাই, বটগাছটির সঙ্গে আমাদের অনেক স্মৃতি। আপনি তো ৭৫ হাজার টাকায় কিনেছেন। আমি এক লাখ টাকা দেব। কিন্তু গাছটি যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে।’

পরে তিনি গাছটি দান করেন মন্দির কর্তৃপক্ষকে। মন্দির কমিটির সহসভাপতি লক্ষণকান্তি দেব বলেন, ‘মোশাররফ সাহেব গাছটি বাঁচিয়ে মন্দিরকে দান করেছেন। বটগাছটি এখন ছায়া দিচ্ছে মানুষকে। উনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা নেই আমাদের।’

প্রবাসে একা : ব্যক্তিজীবনে দুই সন্তানের জনক তিনি। প্রবাসে এখনো মেসে থাকেন। স্ত্রী-সন্তানরা থাকেন স্বদেশে। তাঁদের কখনো যুক্তরাষ্ট্রে নেননি। কারণ কী? ‘মেসে আমি যেনতেনভাবে থাকতে পারি। আলু ভর্তা, ডাল বা ডিম দিয়ে চলে যায় তিন বেলা। পরিবার নিয়ে গেলে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হতো। তাতে খরচ অনেক বেড়ে যেত। বরং সেই টাকা দেশের মানুষের কাজে লাগাতে চেয়েছি।’ সরল-সোজা উত্তর মোশাররফের। এ জন্য স্ত্রী ফয়জুন নাহার চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানালেন তিনি। এ ছাড়া শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, সংসদ সদস্য হাজি জসিম উদ্দিন, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইউনুস, ব্যারিস্টার সোহরাব খান চৌধুরী, জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী, হাজি তৈয়ব আলী, আব্দুল ওদুদ চেয়ারম্যানসহ নানা সময়ে আরো অনেকের সহযোগিতা পেয়েছেন। তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানালেন মোশাররফ।

আনন্দে বাঁচা মানুষ : মোশাররফের বয়স এখন ৬২ বছর। তরুণ বয়সে পড়াশোনায় ছেদ পড়লেও তিনি এখন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটা কলেজে স্নাতকে পড়ছেন। পরীক্ষার সূত্রেই এসেছেন দেশে। বললেন, ‘পড়াশোনার কোনো বয়স নেই। আবার নতুন করে শুরু করতে চেয়েছি।’

ভোগ নয়, ত্যাগের দর্শনে বিশ্বাসী মোশাররফ। বললেন, ‘আমি আনন্দে বাঁচি। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে চিত্ত নেচে ওঠে আমার। যত দিন বাঁচি—আনন্দের খোরাক নিয়েই বাঁচতে চাই।’



error: Content is protected !!