
স্টাফ রিপোর্টার
ঝিনাইদহে ২৪’র ৫ আগস্টের পরে ভাঙচুরের শিকার বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্ত্বর ও ভাস্কর্যটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জেলা শহরের অন্যতম প্রবেশদ্বারে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মরণে চত্ত্বর ও ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্ত্বরের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রতিবাদ, আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিক্ষুব্ধ শহীদ পরিবার ও সচেতন মহলের দাবি, খোঁড়া অজুহাতে অপসারণ নয়, অবিলম্বে যথাযথভাবে ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মরণে নির্মিত চত্ত্বর ও ভাস্কর্য প্রতিস্থাপন করা জরুরি।উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হামিদুর রহমান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহী ছিলেন। ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তঘাঁটি দখলের লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ দেওয়া হয়।তথ্যমতে, ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে জেলা শহরের প্রবেশদ্বারে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্ত্বর’ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ঝিনাইদহ পৌরসভা। একইবছরের ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এ স্থানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরিকল্পনা ছিল ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা নির্মাণের। কিন্তু নির্মাণ কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের অবহেলায় অসমাপ্ত স্থাপনাটি চূড়ান্ত রূপ পায়নি, উল্টো একপর্যায়ে আগাছায় ঢেকে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে দুই দফায় এটিতে ভাঙচুর চালানো হয়। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চত্ত্বরটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। ঝিনাইদহ জেলা শহরের প্রবেশদ্বারে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্ত্বর ও ভাস্কর্যটি গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) থেকে কয়েক দিন ধরে প্রকাশ্যে ভাঙা হচ্ছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্ত্বরে স্মারক ভাস্কর্য ভাঙা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত নয় বলে গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রদান করেছে। পরবর্তীতে আবার নতুন করে সংবাদে স্থান পাচ্ছে, অবয়বে অমিল ও সড়ক দুর্ঘটনার অজুহাতে সরানোর দাবি। কিন্তু দূর্ঘটনার কোন পরিসংখ্যান নেই। বিগত সময়ে আলোচিত স্থানে সড়ক দূর্ঘটনার রেকর্ড তলব করেও কিছু পাওয়া যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক বঙ্গ রাখাল বলেন, ‘কথিত দুর্ঘটনার এই যুক্তিতে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মরণে নির্মিত চত্ত্বর ও ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদের প্রতি হেয় প্রতিপন্ন ও অবমাননা করা হচ্ছে। এই মহান বীর শহীদের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্যে অবয়ব না থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়, ভাস্কর্য আর প্রতিকৃতি পৃথক বিষয়। এসব অজুহাত উপস্থাপন থেকে নিঃসন্দেহে বোঝা যায়, ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রশ্নবিদ্ধ।’
অবাধ চলাচল ও দূর্ঘটনার ঝুঁকিমুক্ত করে ক্রুটিহীন পূর্ণাঙ্গভাবে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্ত্বর ও স্মারক ভাস্কর্য প্রতিস্থাপন করা উচিত বলে দাবি জানিয়েছেন বিক্ষুব্ধ শহীদ পরিবার ও সচেতন মহল। সাংস্কৃতিক সংগঠক আরিফুল ইসলাম মিটুলের মতে,
‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহ নয়, পুরো দেশের গর্ব। জীবন উৎসর্গ করে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের এক অনন্য অধ্যায় রচনা করেছেন। তাঁর নামে একটি চত্ত্বর ও স্মারক ভাস্কর্য সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে জানানোর আবেদন রাখছে। এটি জেলার প্রবেশমুখে হলে আগত দর্শনার্থীরাও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান সম্পর্কে জানতে পারবেন।
দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরের প্রবেশমুখে কোনো না কোনো ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, যেখানে এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি বা ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়। এই ভাস্কর্যটিও তেমন উদ্দেশ্য নিয়েই তৈরি করা।’