
একুশের প্রতিবাদ ”
বিধান চন্দ্র বিশ্বাস
( যুক্ত অক্ষর একমাত্রা ধরে প্রতি লাইনে চৌদ্দ মাত্রা এবং পয়ার ছন্দে ) ।
ঊনিশ্য সাতচল্লিশে দেশ বিভাজন
অশান্তিতে সর্ব ঘটে ছোটো বড়ো জন।
দেশের শাসক ছিল পাকিস্তানী সেনা
বঙ্গভাষা অবহেলে করেছে সে ঘৃনা।
পাকিস্তান পরিষদে চলে জলপনা
রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হবে এই আলাপনা।
জিন্না বসে মনে মনে দুষ্ট বুদ্ধি আটে
উর্দু ভাষা চালু হবে এদেশের বাটে।
মাঝ রাতে জিন্না বলে ভাষার বিবৃতি
সে দিন সময় ছিল মার্চ এর রাতি।
জিন্নাহর দুষ্টু কথা তিক্ত করে প্রাণ
প্রতিবাদে ফেটে পড়ে স্বদেশী সন্তান।
কারো মুখে হাসি আর কারো চোখে জল
কি হবে মোদের ভাষা করে কোলাহল।
জিয়া উদ্দিন প্রস্তাবে হবে উর্দু ভাষা
বঙ্গ দের এই নিয়ে মনে লাগে ঠাশা।
শহিদুল্লাহ প্রস্তাবে এদেশের ভাষা
বাঙলা সবাই চাই এ মোদের আশা ।
উনিশ্য আটচল্লিশ সময় পারায়
একুশের কালো রাত সামনে আগায়।
রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হবে ত্যাজিয়া বাংলা
প্রস্তাব পাঠ করে নইমুদ্দি ছাগলা।
বঙ্গবাসী বীর সেনা তুচ্ছ করি যত
প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বাঙলার পথ।
হানাহানি শোরগোল বাহান্ন হাজির
বঙ্গের দামাল গড়ে মহান নজির।
ভয়ঙ্করী পাকসেনা করেছিলো তাক
বোমাবাজি অস্ত্রাঘাতে রুদ্ধ করে বাক।
রফিক শফিক আরো জব্বার সালাম
আত্মদানে মহিয়ান বরকত নাম।
হাঁকে বাক ঝাঁকেঝাক প্রাণের অক্ষর
মায়ের ভাষার তরে রক্তের সাক্ষর।
যাবে প্রাণ রবে মান এ মাটির তরে
প্রভাতী আলোর ছটা প্রতি ঘরে ঘরে।
পিতা মাতা ভাই বোন রক্তের বাঁধনে
দ্বীপ্তকর হয়ে রবে জনমে জনমে।
মরে বীর লাখে লাখে না জানি নির্নয়
ভাষা নিয়ে প্রাণ গেল বিভীষিকা ময়।
ভাই গেল যম পুরে বোন যে ধর্ষিতা
মায়ে হলো পুত্র হারা বিদিশার দিশা।
পিতার শোকার্ত হিয়া পর্ বত ভারী
সহিতে না পারে শোক বলিতে না পারি।
শতমুখে শেষ নাহি এ দুখের কথা।
শেল বিদ্ধ বক্ষ ছিদ্র অবলার ব্যাথা।
বিঁধিছে বাহিরে কাঁটা অন্তর বিক্ষত
অঝরে ঝরিছে জল নয়নেতে যত।
কূলবঁধু কূলনারী বিধবার বেশ
দিন যায় রাত যায় দুখের না শেষ।
হা- হা করে আত্ম নাদে শিশু পুত্র কাঁদে
আ- মরি বাংলা ভাষা প্রাণে প্রাণে বাঁধে।
এত কষ্ট অতি দুখে মনের বাসনা
আত্ম বলে বলীয়ান তুচ্ছ এ ছলনা।
আর নাই পিছু টান জাগরে বাঙালি
হাজারে হাজারে সেনা দেয় আত্ম বলী।
এমন নজির আর পৃথিবীতে নাই
আপন ভাষার তরে জীবন বিলাই।
রক্তের বন্যায় ভাসে পথ মাঠ ঘাট
দীন হীনে কারো দয়া সৃষ্টির সম্রাট।
হৃদয়ে সহস্র গতি মুহূর্তে সঞ্চিল
মহা মতি বঙ্গবীর জাগিয়া উঠিল।
পদাঘাতে ভাঙি চুড়া হিমালয় প্রতি
বঙ্গবাসী বীর সেনা অজেয় সুখ্যাতি।
শ্রেষ্ঠ ভাষা মিষ্টি কথা বঙ্গের ললনা
কে তাঁরে রুধিতে পারে করিয়া ছলনা।
বঙ্গদেশে জন্ম মোর শতভানু নাম
বাঙলা মোদের বুকে মায়ের সমান।
কে এলো হরিতে যবে মাতৃ মুখ ভাষা
যমপুরী দিবো তার গদা মেরে ঠাশা।
এই বলি বীর পুত্র হুংকার ছাড়ে
কম্পিত মেদিনী আজি শব্দ বৃত্ত ভারে।
হেনো ভাষা কোথা নাই জগত মাঝার
না ছাড়ি জীবনে তাঁর মরণ স্বীকার।
স্ব- স্বরে ভেদিল নাদ আকাশ পাতাল
বীর দলে পদ সেনা হাঁকিল সাবাশ।
রক্ত ভেজা রাজ পথ গেল কত প্রাণ
এক সাথে গাঁথা মোরা নাহি পিছুটান।
প্রলয়ের বেগ যথা পবনের গতি
লন্ড ভন্ড করি পন্ড জয়জয় গীতি।
চক্রের তান্ডব লীলা বিশ্বরুপ ধরি
রাজ পথে পড়ি সেনা যায় গড়াগড়ি।
চারিদিকে শোরগোল আ- মরি আ- মরি
মাতৃভাষা রক্ষা হেতু বীর সারি সারি।
জয়জয় শব্দ উঠি সপ্তম আকাশে
ছাড়িলো যাতকী বান পাকসেনা নাশে।
যাতকী ঘাতক বড় কিছু নাহি মানে
যেথা আছে শত্রু সেনা যাতকী তা জানে।
হিতরী বিতরী নাগ পাক অস্ত্র যত
খান খান ভেঙে পড়ে ধুলোয় নির্মত।
ছাড়িলো করোতি বাণ শত্রু হানি বারে
যত ছিল শত্রু সেনা এক দন্ডে মারে।
নিমেষে বিষম শত্রু হয়ে গেল নাশ
হৃদয়ে বাংলা ভাষা জ্যোতির প্রকাশ ।
স্নেহ মাখা দেশ গড়ি শত্রু করি দূর
মায়ের মুখের ভাষা বড় সুমধুর।
নিজ ভাষা খাশা মোর পূর্ণ চন্দ্র জ্যোতি
বৈষ্ণব মহতি গায় প্রেম রস গীতি।
অ- আ সাজায়ে অক্ষর যত কাব্য লিখি
প্রমোদে মজিল মন হেন কাব্য শিখি।
মায়ের ভাষায় গাঁথা শেখা যত গান
ক্লান্ত ভুলি শান্ত প্রাণ কবির্ বয়ান ।
মায়ের আঁচল পরে ঘুমায় যখন
স্বর্গময় যত সুখ মিলায় তখন।
নব জাতি বাস করি কেহ নাহি পর
কামার কুমার তাঁতি সবা সবাকার।
সূতার নাপিত ধোপা এক সূত্রে গাথি
নেই কোনো ভেদাভেদ সবে এক সাথি।
কুলি মুজুর ও চাষি একসাথে খাটি
এদেশ গড়বো মোরা এ আমার মাটি।
জনম তোমার কোলে চির সুখ মাগী
মরণ তোমার বুকে এ মিনতি রাখি।