সেন বাংলা টেলিভিশন নিউজ ডেস্কঃ
ব্যাকডেটে নিয়োগ, বিষয় পরিবর্তন, জাল সনদ ও ভুয়া ই-রিকুইজিশন দেখিয়ে এমপিও— তদন্তের দাবি
এমপিও অনুমোদনে অনিয়মের অভিযোগ, কাঠগড়ায় মাউশির খুলনা অঞ্চলের ডিডি কামরুজ্জামান
নিয়োগে অনিয়ম, ব্যাকডেটে নিয়োগ দেখানো, নিয়োগের বিষয়ের সঙ্গে এমপিওভুক্তির বিষয়ের অসঙ্গতি, জাল সনদ ও ভুয়া ই-রিকুইজিশন ব্যবহার এবং অনুমোদিত বিষয়ের বাইরে শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) খুলনা অঞ্চলের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. কামরুজ্জামান। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট ফাইলের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও বিধিমালা অনুসরণ করেই এমপিও অনুমোদনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ ওঠা কিছু ফাইল এখনো প্রক্রিয়াধীন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মাউশির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সরকারি তালিকায় মো. কামরুজ্জামানকে উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার ডাঃ নূরুল হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তৌহিদা আক্তার দিনাকে ২০১৪ সালে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগ ও যোগদান দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের আগে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) জরিপে তাঁর নাম পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালে নিয়োগ দিয়ে তা ব্যাকডেটে ২০১৪ সাল দেখানো হয়। এরপর গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মাউশির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান তাঁর এমপিও ফাইল অনুমোদন করেন। তবে ওই অনুমোদনে বিষয় হিসেবে ইংরেজি উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। অর্থাৎ নিয়োগ ও যোগদান সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে দেখানো হলেও এমপিও করা হয়েছে ইংরেজি বিষয়ে। এ বিষয়ে তৌহিদা আক্তার দিনার বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাগুরার মোহাম্মদপুর উপজেলার বাশো মাছিনাগড়া নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বকুল বিশ্বাসকে ২০১৪ সালে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগ ও যোগদান দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৩ সালের আগে ব্যানবেইসের তথ্যভাণ্ডারে শিক্ষক হিসেবে তাঁর নাম পাওয়া যায়নি। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর তাঁকে ব্যাকডেটে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগ দেখানো হয় বলে অভিযোগ। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তাঁর এমপিও অনুমোদন করা হয়েছে বাংলা বিষয়ে।
অভিযোগের বিষয়ে বকুল বিশ্বাসের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ব্যস্ত থাকার কথা জানান। পরে নিয়োগের সাল ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। একপর্যায়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
যশোরের চৌগাছা বি. কে. এইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান মো. মইনুদ্দিন আহম্মেদকে ২০১৬ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ নিয়ে জটিলতার কারণে তাঁর এমপিও আবেদন একাধিকবার অনুমোদন পায়নি বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন। তবে পরবর্তীতে রয়্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে নতুন করে ডিগ্রি অর্জন করে সেই সনদের ভিত্তিতে ডাউনগ্রেড স্কেলে ১১তম গ্রেডে তাঁর এমপিও অনুমোদন হয়েছে বলে দাবি করেন মইনুদ্দিন আহম্মেদ। তিনি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁর সব শিক্ষাগত সনদ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বৈধ। কোনো অস্পষ্টতা থাকলে সরাসরি নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিষয়টি যাচাই করার জন্য প্রতিবেদককে আমন্ত্রণও জানান তিনি।
মেহেরপুরের গাংনী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী শিক্ষক মো. হাসানুজ্জামানের নিয়োগ ও যোগদানের বিষয় হিসেবে সমাজবিজ্ঞান দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সর্বশেষ এমপিওতে ইংরেজি বিষয়ে তাঁর ফাইল অনুমোদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগটি অস্বীকার করে হাসানুজ্জামান বলেন, নিয়োগ ও যোগদানের শুরু থেকেই তিনি ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। ব্যানবেইসের তথ্যেও তাঁকে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর দাবি, নিয়োগ থেকে এমপিওভুক্তি পর্যন্ত সব দাপ্তরিক কার্যক্রম ইংরেজি বিষয়কে কেন্দ্র করেই হয়েছে। ফলে বিষয় পরিবর্তন বা কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার কোমরভোগ রমানাথপুর নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম, অফিস সহায়ক মোছা. বৃষ্টি খাতুন, নৈশপ্রহরী মো. গোলাম মোস্তফা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোছা. আর্জিনা খাতুন এবং সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) মোছা. রাশিদা খাতুনের এমপিও ফাইল নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁদের এমপিও আবেদন খুলনা অঞ্চল থেকে বাতিল হওয়ার পর ২৬ জুন পুনরায় আবেদন পাঠানো হয়। পরে ওই পাঁচজনের এমপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মোট ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁদের এমপিও অনুমোদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলামের নিয়োগকালীন বিএড সনদ না থাকা, পরবর্তী সময়ে জাল বিএড সনদ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে।
মো. কামরুজ্জামান এর আগে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০২৩-২৪ সালে মাউশির ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। এমন তথ্য বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়মনসিংহ অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগের পর তাঁকে ওই দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে মাউশিতে সংযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক পদে তাঁর পদায়নের তথ্য প্রকাশিত হয়। ময়মনসিংহে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত নয়, এমন বিষয়ে শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা, জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ও ভুয়া এনটিআরসিএ ই-রিকুইজিশন ব্যবহারসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে পরবর্তীতে সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং তদন্তের কথাও জানা যায়।
মাউশির খুলনা অঞ্চলের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে এরিমধ্যে ডিজি থেকে তা স্থগিত বন্ধ করা হয়েছে।